
ছবি: সংগৃহীত (ফাইল) | মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসংঘে কূটনৈতিক ব্যস্ততায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফর; বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের সম্ভাবনা
Shaplapur News | বিশেষ প্রতিনিধি
আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ-৮১) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্ভাব্য সফরসূচি অনুযায়ী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন। সফরের কেন্দ্রবিন্দু হবে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে তার ভাষণ। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকেও অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক মহলে এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য চলতি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র, পররাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফর ৮ থেকে ১০ দিনের হতে পারে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শেষ করে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো সফর করবেন। সেখানে দুই দিনের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর সেখান থেকেই দেশে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও পুরো সফরসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সফর কেবল জাতিসংঘের নিয়মিত অধিবেশনে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্য বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সফরকালে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজনের বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মূল মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন। ওই ভাষণে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরতে পারেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এবারের অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক পর একই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে একজন বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের সরকারপ্রধান একই অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করার একটি বিরল সুযোগ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রোটোকল, আবাসন এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রায় দুই দশক পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো সফরকে স্মরণীয় করে তুলতে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে বড় পরিসরের একটি নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ভার্চুয়াল প্রস্তুতি সভা করেছেন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিউইয়র্কে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিতে পারেন। ফলে এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় মিলনমেলায়ও পরিণত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফরে যাবেন। তবে সফরের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বিষয়গুলো সমন্বয় করা হচ্ছে। সব প্রস্তুতি শেষ হলে বিস্তারিত সফরসূচি প্রকাশ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার মঞ্চ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে।
উল্লেখ্য, সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ থেকে ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। ওই সফরে জনশক্তি রপ্তানি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, করিডোর উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের আগে আপাতত অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সফরের পরিকল্পনা নেই। ফলে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরই হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী বড় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিশন, যার দিকে দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক মহল এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।


