
Shaplapur News | নিজস্ব প্রতিবেদক
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছিলেন শতবর্ষী মা ও তার শতবর্ষী কন্যা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ দুজনই আজ অসহায়। একজনের বয়স প্রায় ১৩০ বছর, অন্যজনের প্রায় ১০০ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একে অপরই তাদের একমাত্র ভরসা। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চিত আশ্রয়ে কাটছিল তাদের প্রতিটি দিন। অবশেষে মানবিক মানুষের সহযোগিতায় বদলে গেছে তাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম ও তার মেয়ে মানিকজানের জীবনের গল্প যেন সংগ্রাম, বেদনা আর টিকে থাকার এক অনন্য ইতিহাস। স্বাধীনতার পরপরই স্বামীকে হারান ফাতেমা বেগম। এরপর দীর্ঘ সময় নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে সংসার চালিয়ে যান। প্রায় এক দশক আগে মারা যান তার একমাত্র ছেলে। সেই থেকে মা-মেয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরেই জীবনের শেষ সময় পার করছেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রে তাদের বয়স তুলনামূলক কম উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফাতেমা বেগমের প্রকৃত বয়স ১২৫ থেকে ১৩০ বছরের মধ্যে এবং তার মেয়ে মানিকজানের বয়স প্রায় ১০০ বছর। দীর্ঘ জীবনের নানা স্মৃতি বয়ে বেড়ালেও তাদের বাস্তব জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। বয়সজনিত কারণে তারা নিজেরাই ঠিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। একটি ভাঙাচোরা, ঝুঁকিপূর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই কাটছিল তাদের দিন-রাত। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ত, ঝড়ের সময় আতঙ্কে রাত কাটাতে হতো। যে কোনো সময় ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
প্রতিবেশীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়াতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ওষুধ কিনে দিতেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় ছোটখাটো কাজে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু একটি নিরাপদ বসতঘরের স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরেই অধরাই ছিল।
এমন অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে এগিয়ে আসে মানবিক সেবা ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির সদস্যরা প্রথমে তাদের জন্য খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেন। পরে সরেজমিনে তাদের বসতঘরের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে একটি টেকসই ও নিরাপদ ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সংগঠনের উদ্যোগে অল্প সময়ের মধ্যেই মা-মেয়ের জন্য নতুন একটি বসতঘর নির্মাণ করা হয়।
নতুন ঘর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফাতেমা বেগম ও মানিকজান। জীবনের শত বছরেরও বেশি সময়ের নানা স্মৃতি, শৈশব, সংসার, স্বজন হারানোর কষ্ট এবং সংগ্রামের গল্প বলতে বলতে তাদের চোখে আনন্দের অশ্রু ফুটে ওঠে। নিরাপদ একটি আশ্রয় পেয়ে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।
স্থানীয়দের মতে, জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই এই মা-মেয়ের কেটেছে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। শেষ বয়সে একটি নিরাপদ ঘর পাওয়াই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তারা মনে করেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক মানুষ যদি এভাবেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে আরও অনেক দরিদ্র ও আশ্রয়হীন পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।
গ্রামবাসীরাও মানবিক সেবা ফাউন্ডেশনের এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের ভাষ্য, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি নিজেদের সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বেশি গ্রহণ করে, তাহলে অনেক অসহায় মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে।
ফাতেমা বেগম ও মানিকজানের গল্প শুধু একটি পরিবারের সংগ্রামের কাহিনি নয়, এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ববোধেরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি নিরাপদ ঘর তাদের কাছে শুধু আশ্রয় নয়, বরং নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস ও স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।


