প্রকাশকাল: ২২ আগস্ট ২০২৬ | শনিবার | রাত ৯:৫৯ মিনিট

ছবি: বর-কনের ঠিক পেছনে রুহুল আমিন রুবেল
বাবা নেই প্রায় এক দশক। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন মা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। সামর্থ্য না থাকায় বড় কোনো আয়োজনের কথা ভাবতেও পারেননি।
ঠিক সেই সময় পাশে দাঁড়ান নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল। শুধু বিয়ের খরচ বহন নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম আয়োজন করে দিয়েছেন বিয়ের অনুষ্ঠান। বরযাত্রী আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবার ও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—কোনো কিছুতেই রাখেননি কমতি।
এভাবেই গত ২৪ বছরে অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম ১১২ জন মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন রুবেল।
শনিবার (২২ আগস্ট) তার উদ্যোগে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে বিয়ের সাজসজ্জায় তৈরি করা হয়েছে গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য সাজানো হয়েছে চেয়ার-টেবিল। বাড়ির এক পাশে চলছিল রান্নার ব্যস্ততা। গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার তৈরি করা হচ্ছিল।
বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদল নারী ব্যস্ত ছিলেন কনেকে সাজাতে। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা আর ভেতরে কনের সাজ—সব মিলিয়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাড়ি।
প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও মেয়েকে আগলে রেখেছেন।
মেয়ের বিয়ের বয়স এলে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন জহুরা খাতুন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বড় আয়োজনের সামর্থ্য ছিল না তার। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম দেখতে পান তিনি। পরে রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিথির পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান রুবেল। এরপর দিন-তারিখ ঠিক করা হয়। শুক্রবার রাতে শুরু হয় গায়ে হলুদের আয়োজন। শনিবার দিনভর চলে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা।
জুমার নামাজের পর কনে বাড়িতে আসেন বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা। পাশের রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
যে বাড়িতে এতদিন অভাবের ছাপ ছিল, সেদিন সেই বাড়িতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। মায়ের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আনন্দ।
তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেছেন। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।
নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি বলেন, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব তেমনভাবে অনুভব করতে পারেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।
বর তরিকুল ইসলামও কনে বাড়ির আতিথেয়তা ও বিয়ের আয়োজনের প্রশংসা করেন। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসীও রুবেলের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও মানবিক কাজ।
রুহুল আমিন রুবেল বলেন, কোনো প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের জন্যই গত ২৪ বছর ধরে তিনি অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আসছেন।
তিনি জানান, তিথির বিয়েটি তার ১১২তম। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।
একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় যেন সেই দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানবিকতা ও ভালোবাসায় হয়ে উঠেছিলেন বাবার মতো একজন অভিভাবক।
রুবেলের ১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প। নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের ঘরে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলা এক মানুষের মানবিকতার গল্প।
Disclaimer: This report has been prepared based on information provided by the concerned individuals, family members, and local sources. If anyone has any objection to or wishes to provide corrections regarding the information published in this report, they are requested to contact us with supporting evidence. Any statement or claim mentioned in this report should not be considered a final legal judgment.
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।


