
প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৬ | সোমবার | ৫টা ৩৩ মিনিট
নিজস্ব প্রতিবেদক, শাপলাপুর নিউজ
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এবারের ফলাফলে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে সামগ্রিক ফলাফলের পাশাপাশি বেশ কিছু পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এবার সারা দেশে মোট ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়নি। বিপরীতে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৩১৫টি।
সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে এবার এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা ৮ দশমিক ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট এগিয়ে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফলেও উদ্বেগের একটি দিক রয়েছে। এবার ৫৭টি বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৪৮টি। অর্থাৎ শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এখানেও পাসের হারে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯ জন কমেছে।
ফলাফলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিদেশের কেন্দ্রগুলো। বাংলাদেশের বাইরে ৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪০২ জনের মধ্যে ৩৫৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। সেখানে গড় পাসের হার ৮৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।
তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল। একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ হলেও বিষয়টি এত সরল নয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট, শিক্ষা উপকরণের প্রাপ্যতা, পারিবারিক পরিবেশ, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং একাডেমিক তদারকিসহ বিভিন্ন বিষয় ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী ব্যর্থ হলে সেখানে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে ছিল, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের আগের ফলাফল কেমন ছিল এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তার ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি।
একইভাবে শতভাগ পাস করা ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের কারণও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয় এবং নিয়মিত মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর মডেল হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষার ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়লে শুধু দায় নির্ধারণের পরিবর্তে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সঙ্গে তার নিজের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে তাদের ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকির মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এবারের ফলাফলকে তাই শুধু পাস-ফেলের সংখ্যা দিয়ে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ সামগ্রিক পাসের হার, ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস, ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো তথ্যগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান চিত্রটি আরও পরিষ্কার হবে।
ফলাফলে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ। ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে।
সবশেষে, এবারের ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পরীক্ষার ফল শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়, একই সঙ্গে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি ও দুর্বলতারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।


