কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিখোঁজ ছেলের মরদেহ উদ্ধার, মাথায় আঘাতের চিহ্ন

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিখোঁজ ছেলের মরদেহ উদ্ধার, মাথায় আঘাতের চিহ্ন

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রায় ২১ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতীমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং এ ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানান, শনিবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন জঙ্গলের ভেতর থেকে অপ্রতীমের মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে।

ওসি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ কাজ করছে।

যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিল অপ্রতীম

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতীম। এরপর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সে বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই তার বন্ধু ও পরিচিতদের কাছে খোঁজ নেওয়া হয়। পরে দীর্ঘ সময়েও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

একই সঙ্গে অপ্রতীমকে খুঁজে বের করতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিভিন্নভাবে চেষ্টা শুরু করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে থাকা মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে অপ্রতীমের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর তার সঙ্গে থাকা ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ছেলেকে দ্রুত খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের সহযোগিতা চেয়েছিলেন অপ্রতীমের মা নাহিদা বেগম।

জঙ্গল থেকে মিলল মরদেহ

নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন স্থানে অপ্রতীমের সন্ধান চালানো হচ্ছিল। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে তার মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অপ্রতীমের নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তার গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মেলেনি মায়ের আইফোন

অপ্রতীম যেই আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল, সেটি এখনো পাওয়া যায়নি বলে পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রাথমিক ধারণা, ওই আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতীমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি ধারণা। হত্যার প্রকৃত কারণ কী এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আইফোনটির সন্ধান পাওয়া গেলে এবং ফোনটির অবস্থান ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম জানান, অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে আসছিল। পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

তিনি জানান, অপ্রতীমকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মরদেহ হিসেবে পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখনো উদ্ধার হয়নি।

অপ্রতীম কে ছিল

ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে। সে কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

মাত্র ১৩ বছর বয়সী অপ্রতীমের নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ২১ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধারের খবরে পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

তদন্তে বেরিয়ে আসবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ

অপ্রতীমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন থাকলেও তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। এটি দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোনো ঘটনার পরিণতি—ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা তথ্য, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অপ্রতীমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *