
প্রকাশকাল: ১৫ অক্টোবর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | শাপলাপুর নিউজ
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নেওয়া হবে লিখিত পরীক্ষা। নতুন এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারিভিত্তিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা ও অভিজ্ঞতার পর আবারও দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে পরীক্ষার বিধান চালু হওয়ায় ভর্তি কার্যক্রমের ধরন বদলাতে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, অভিভাবকদের ব্যয়, কোচিংনির্ভরতা এবং বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ কতটা প্রভাবিত হবে—সেসব প্রশ্ন সামনে আসছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৩ অক্টোবর জারি করা নীতিমালায় প্রথম শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে ডিজিটাল লটারির কথা বলা হয়েছে। এ কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। একজন আবেদনকারী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচটি বিদ্যালয় পছন্দক্রমে নির্বাচন করতে পারবে। তবে দুই পালায় পরিচালিত কোনো বিদ্যালয়ের উভয় পালা পছন্দ হিসেবে নির্বাচন করা হলে তা দুটি পছন্দ হিসেবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
নতুন নীতিমালায় দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষার বিধান থাকায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও মূল্যায়নের বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষার পরিবেশ এবং ফলাফল প্রকাশের স্বচ্ছতার ওপর এ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
একই সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি আলাদা প্রস্তুতি নিতে হলে কিছু শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সেই চাপ কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে পরীক্ষার পাঠ্যসূচি, প্রশ্নের ধরন, প্রস্তুতির সময় এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব পরিস্থিতির ওপর।
লটারি পদ্ধতির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা কমিয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে সুযোগ বণ্টন করা। এ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আলাদা কোচিং বা দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সময় এবং অর্থ ব্যয়ের চাপও কিছুটা কমার সুযোগ থাকে।
তবে লটারি পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পছন্দের বিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত থাকলে লটারিতে নির্বাচিত না হওয়া শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আবার শুধু লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হলে তাদের পূর্ববর্তী শিক্ষাগত প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত থাকে।
অন্যদিকে, পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকলেও আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত প্রস্তুতি ও কোচিংয়ের সুবিধা পেতে পারে। তাই ভর্তি পদ্ধতি যেটিই হোক, সব শিক্ষার্থীর জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অভিভাবকদের ওপর বাড়তে পারে প্রস্তুতির চাপ
স্কুলে ভর্তির সিদ্ধান্ত শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকদের জীবনযাপন ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। লিখিত পরীক্ষা চালু হলে অনেক অভিভাবক সন্তানকে পরীক্ষার উপযোগী করে তুলতে অতিরিক্ত পড়াশোনা, গৃহশিক্ষক কিংবা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে পরিবারের শিক্ষা ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে সব শিক্ষার্থীকে কোচিং করতে হবে, এমন কোনো অবধারিত পরিস্থিতি নেই। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম অনুসরণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং যথাযথ দিকনির্দেশনার মাধ্যমেও প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার পাঠ্যসূচি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি স্পষ্টভাবে জানানো হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
শিক্ষাবিদদের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে, শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি যেন শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও বিশ্রামের সময়কে অযথা সংকুচিত না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখার আছে?
বিভিন্ন দেশে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য স্থানীয় এলাকার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ, নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত, অতিরিক্ত আবেদন হলে লটারি কিংবা অন্যান্য মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কোন পদ্ধতি কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা, শিক্ষার মান এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর।
তাই অন্য কোনো দেশের ভর্তি পদ্ধতি সরাসরি অনুসরণ না করে বাংলাদেশের সরকারি বিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংখ্যা, শ্রেণিকক্ষের সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থার পার্থক্য নীতিমালা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ভর্তি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে
ভর্তি পরীক্ষা ও লটারি—দুই পদ্ধতির ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হলে প্রশ্নপত্রের মান, পরীক্ষার নিরাপত্তা, মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা এবং ফলাফল প্রকাশের নিয়ম পরিষ্কার থাকতে হবে। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা যাচাই ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ডিজিটাল লটারির ক্ষেত্রে আবেদনসংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা, পছন্দক্রমের সঠিক হিসাব, ফলাফল যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর আসনসংকট কমানো, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং মানসম্মত শিক্ষা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ, ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই শিক্ষার সব সমস্যা সমাধান হয় না। বিদ্যালয়ের মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, পাঠদানের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নও শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নতুন নীতিমালার প্রভাব বোঝা যাবে বাস্তবায়নের পর
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির নতুন নীতিমালায় প্রথম শ্রেণিতে ডিজিটাল লটারি এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে ভর্তি কার্যক্রমে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও অভিভাবকদের ব্যয় নিয়ে নতুন আলোচনা সামনে আসতে পারে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কতটা বাড়বে, ভর্তি প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে এবং সব শ্রেণির শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে কি না—তা নির্ভর করবে নীতিমালার বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার ওপর।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এমন ভর্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ন্যায্য সুযোগ, মানসিক বিকাশ এবং মানসম্মত শিক্ষার অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।



