
ছবি: ফাতেমা ও তাঁর দুই কন্যা
প্রকাশকাল: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | বুধবার
মহেশখালী প্রতিনিধি: স্বামীকে হারিয়েছেন ফাতেমা বেগম। স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেছিলেন তিনি। কিন্তু একসময় সেই মামলারই এক আসামির পরিবারের করা পাল্টা মামলায় তাঁকেই হতে হয় আসামি। পরে ১৫ মাস বয়সী শিশুকে কোলে নিয়ে সাত দিন কারাগারে কাটাতে হয় তাঁকে। তাঁর অপর দুই সন্তানকে থাকতে হয় এতিমখানায়।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমের ফাতেমা বেগমের ঘটনাটি শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তদন্ত প্রতিবেদন, কথিত সাক্ষী এবং পাল্টা মামলাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন।
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মুহাম্মদ কাশেমকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। কাশেম পেশায় জেলে ছিলেন। পরদিন তাঁর স্ত্রী ফাতেমা মহেশখালী থানায় মামলা করেন। মামলায় রাসেলসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। রাসেল ছিলেন ওই মামলার চার নম্বর আসামি।
কাশেম হত্যার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। তবে এ ঘটনায় কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর প্রায় চার মাস পর, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট রাসেলের মা নুর জাহান বেগম আদালতে একটি নালিশি মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমাসহ সাতজন তাঁদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন।
আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত করেন মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের বক্তব্য নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁদের দাবি, তাঁরা ওই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি সাক্ষী হিসেবে তাঁদের নাম কীভাবে এসেছে, সেটিও তাঁরা জানেন না বলে জানান।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে কোনো ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনাও ঘটেনি। স্থানীয় আরও কয়েকজন বাসিন্দা এবং কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামালও ওই দিন এমন কোনো ঘটনার কথা অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম বলেছেন, তিনি সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেই তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তে বাদীপক্ষের দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে যাঁদের সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন যদি প্রকাশ্যে বলেন তাঁরা কোনো সাক্ষ্যই দেননি, তাহলে তাঁদের বক্তব্য তদন্ত প্রতিবেদনে কীভাবে যুক্ত হলো?
কারণ একটি তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই যদি কারও বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়, তাহলে প্রতিবেদনে থাকা প্রতিটি তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আসে ফাতেমা বেগমের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
গত ৩১ আগস্ট রাতে পুলিশ ফাতেমা, তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত রাশেদা ও নাছিমাকে জামিন দিলেও ফাতেমাকে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ কারাগারে পাঠানো হয়।
মা যখন কারাগারে, তখন তাঁর অপর দুই সন্তান রাজমিন ও মিশকাত জান্নাতকে থাকতে হয় এতিমখানায়। তাদের একজন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী, অন্যজন প্রথম শ্রেণির।
একদিকে কারাগারে মায়ের কোলে ১৫ মাস বয়সী শিশু, অন্যদিকে মাকে ছাড়া এতিমখানায় দুই ছোট সন্তান—ফাতেমার পরিবারের জন্য সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
শেষ পর্যন্ত সাত দিন কারাভোগের পর ৭ সেপ্টেম্বর জামিন পান ফাতেমা। মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত এক হাজার টাকা বন্ডে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।
ফাতেমার বিষয়টি জানার পর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান তাঁকে আইনি সহায়তা দিতে জেলা লিগ্যাল এইডকে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এতিমখানায় থাকা তাঁর দুই সন্তানের দেখভালের জন্য মহেশখালীর ইউএনওকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
ফাতেমা এখন জামিনে মুক্ত। তাঁর সন্তানরাও ফিরে পেয়েছে মাকে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও কথিত সাক্ষীদের বক্তব্য ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যাঁদের সাক্ষী বলা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন যদি বলেন তাঁরা সাক্ষ্য দেননি, স্থানীয় বাসিন্দারা যদি বলেন ঘটনাটিই ঘটেনি এবং তদন্ত প্রতিবেদনে যদি তার বিপরীত তথ্য উঠে আসে, তাহলে পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত ও যথাযথ তদন্ত প্রক্রিয়া। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও তথ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ফাতেমার ঘটনাটি তাই শুধু একজন মায়ের সাত দিনের কারাভোগের ঘটনা নয়; এটি তদন্তের নির্ভুলতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং একজন স্বামীহারা নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
Disclaimer: The information published by Shaplapur News is collected from available sources and is published in good faith for public interest. Allegations mentioned in any report are presented as allegations and do not constitute a final determination of guilt. Shaplapur News does not intend to defame or harm the reputation of any individual, organization, or institution. If any information is found to be inaccurate or requires correction, please contact us for appropriate review and correction.
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©
© 2026 Shaplapur News. All Rights Reserved.